VAT

ভ্যাট কী?
সরকার পরিচালনা তথা দেশের উন্নয়নের জন্য দরকার রাজস্ব। রাজস্ব আহরণের যত ধরণের ব্যবস্থা আছে, তাদের মধ্যে সকল নাগরিককে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থার নাম হচ্ছে ভ্যাট (VAT) । ভ্যাট বলতে Value Added Tax কে বুঝায়, বাংলায় যাকে মূল্য সংযোজন কর বলে। সহজ ভাষায় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিভিন্ন স্তরে মূল্য সংযোজনের উপর যে কর আরোপ করা হয় তাই ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর। এটি এমন এক পরোক্ষ কর ব্যবস্থা যেখানে করভার বহণ করে ভোক্তা। আর এই পরোক্ষ কর ব্যবস্থায় কর আদায় হয় Business Entity এর মাধ্যমে।

১৯২০ সালে ভন সিমেন্স VAT এর ধারণা দেন। কিন্তু এর মূল যাত্রা মূলত শুরু হয় ১৯৫৪ সালে ফ্রান্সে। ফ্রান্স এবং জার্মানী ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে সফলতা পায়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৫টি দেশে ভ্যাট ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে।

ভ্যাট কেন দিব?
দেশের সার্বিক উন্নয়ন, কর-জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ নিম্নরূপ কারণে ভ্যাট প্রদান করতে হয়ঃ 

◙ অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি


শিক্ষা স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপত্তার মত সেবা প্রদানের জন্য রাষ্ট্রের যে অর্থের প্রয়োজন হয় তার অন্যতম যোগানদার হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব তথ্য ভ্যাট। ভ্যাটের বৃদ্ধি একদিকে যেমন বিভিন্ন ধরণের সেবা সরকারের কাছ থেকে পেতে সাহায্য করবে, ঠিক একইভাবে বৈদেশিক সাহায্য (Foreign Aid) এর উপর নির্ভরতা কমাবে।

◙ আত্ম-মর্যাদাবৃদ্ধি

রাষ্ট্রের উন্নয়নে যখন প্রত্যেকের একটা ভূমিকা থাকে তখন প্রত্যেকটি নাগরিক গর্ববোধ করে। উন্নয়ন সাহিত্যে (Development Literature) Free Rider রাজস্ব দেয় না কিন্তু বাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ । সুবিধা ভোগ করে তাদেরকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কিন্তু ভ্যাটি ব্যবস্থা প্রায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে এই গ্লানি থেকে মুক্তিব সুযোগ দিয়েছে। একজন নাগরিক তার প্রত্যেক ভ্যাটযোগ্য পণ্য ও সেবা ভোগের সাথে সাথে রাষ্ট্রের কোষাগারে হ্যাট রাজস্ব প্রদান করে আত্মা-মর্যাদাবান নাগরিক হবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।

◙ ব্যক্তিগত প্রাপ্তি

আমরা ভ্যাট দেই বলেই রাষ্ট্র আমাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যেমন- চলাচলের জন্য রাস্তা-ঘাট: সেতু: শিক্ষার জন্য বিনামূল্যে বই: সামাজিক নিরাপত্তা: ব্যক্তি জীবনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নিরাপত্তা: স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য চিকিৎসা ইত্যাদি প্রদান করতে পারে। এছাড়াও একজন ভোক্তা ভ্যাট প্রদানের চালান গ্রহণ করে লটারীর মাধ্যমে পুরস্কার পেতে পারেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রত্যেক মাসে লটারীর মাধ্যমে ১০১ জন ভোক্তাকে ১২.১৫ লক্ষ টাকার পুরস্কার প্রদান করে থাকে।

◙ সামষ্টিক উন্নয়ন

সামষ্টিক উন্নয়নে যতগুলো মাপকাঠি আছে GDP (Gross Domestic Product) তার মধ্যে অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। সমালোচনা থাকলেও, জিডিপি যত বাড়বে মানুষের জীবনযাত্রার মান তত বাড়বে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। এই জিডিপি বৃদ্ধিতে ভ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভ্যাট যত বেশি আহরিত হবে সরকার তত উন্নয়ন কাজে ব্যয় করতে পারবে যা পরবর্তী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

ভ্যাট কীভাবে দিব?

ভ্যাট একটি ভোক্তা কর, বিধায় ভোক্তার ভূমিকা এখানে সব থেকে বেশি। নিম্নে ভোক্তা, উৎপাদনকারী, উৎসে কর কর্তনকারী, খুচরা দোকানদার, টার্নওভার ভ্যাট প্রদানকারী কীভাবে ভ্যাট দিবে তা উপস্থাপন করা হলো:

v ভোক্তা- কোনো পণ্য উৎপাদনের পর বিভিন্ন মাধ্যম যেমন ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর এবং রিটেইলার এর মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছায়। ভোক্তা যখন কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয় করে এবং মূসক চালান (মূসক ৬.৩) গ্রহণের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে তখনই সেই মূসক সরকারের প্রাপ্য হয়, কেননা বিক্রেতা মুসক সংগ্রহ করে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করে থাকে। কাজেই একজন ভোক্তার দায়িত্ব হলো পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সাথে সাথেই ভ্যাট চালান বুঝে নেওয়া।

v খুচরা দোকানদার- খুচরা ব্যবসায়ী সাধারণত তার বিক্রয়ের বিপরীতে ৫% হারে মূসক ক্রেতার কাছ থেকে সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট করমেয়াদ শেষে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করে থাকে। কোন ব্যবসায়ী ইচ্ছে করলে ১৫% হারে ভ্যাট প্রদান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যবসায়ী তার উপকরণ ক্রয়ের বিপরীতে ইতিপূর্বে পরিশোধিত ভ্যাট রেয়াত গ্রহণ করতে পারবেন।

v উৎপাদনকারী- উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিপরীতে ভ্যাট চালানের মাধ্যমে যে কাঁচামাল ক্রয় করে থাকে তা ইনপুট ট্যাক্স হিসেবে বিবেচ্য। পরবর্তীতে উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়ের বিপরীতে যে আউটপুট ট্যাক্স হয় তা হতে ইনপুট ট্যাক্স বাদ দিয়ে যে নীট প্রদেয় সৃষ্টি হয় তা A-Challan এর মাধ্যমে প্রতি করমেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে দাখিলপত্রের সাথে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করে থাকেন।

v উৎসে কর কর্তনকারী- উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ভ্যাট চালানের মাধ্যমে ক্রয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য ভ্যাট নিজে জমা করে কোনো করমেয়াদ সমাপ্তির ৭ দিনের মধ্যে নির্ধারিত অর্থনৈতিক কোডে সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা প্রদান করে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে মূসক ৬.৬ ও ট্রেজারি চালানের কপি বিক্রেতাকে সরবরাহ করবে।

v টার্নওভার ভ্যাট প্রদানকারী- যেসব প্রতিষ্ঠানের (আইনি নির্দেশনা না থাকলে) বার্ষিক বিক্রয় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত সেসব প্রতিষ্ঠানকে ৪% হারে টার্নওভার কর প্রদান করতে হয়। টার্নওভার ভ্যাট প্রদানকারী ৩ মাস পর পর টার্নওভার কর রিটার্ন (মূসক ৯.২) দাখিল এর মাধ্যমে সরকারি পাওনা রাজস্ব প্রদান করবেন।